বরিশালে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তাদের অনেকের নাম এখনও তালিকায় নেই

ডেস্ক রিপোর্ট :

জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে জেলার গৌরনদী উপজেলার যুদ্ধাহত জাতীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক সৈয়দ মনিরুল ইসলাম বুলেট ছিন্টু আক্ষেপ করে বলেন, যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে সরাসরি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে যুদ্ধ করেছেন তাদের অনেকের নাম এখনও তালিকায় নেই।
অথচ স্বাধীনতা বিরোধীদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম লিখিয়ে সরকারী সুবিধা ভোগ করছেন। দিয়াশুর গ্রামের তালেব আলী হাওলাদারের ছেলে এইচএম আলাউদ্দিন ও এইচএম মহিউদ্দিন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বীরত্বের ভূমিকা পালন করেছিলেন। এজন্য ¯’ানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকসেনারা তালেব আলী হাওলাদার ও তার স্ত্রী আছিরোন নেছাকে ধরে নিয়ে সরকারী গৌরনদী কলেজের পাক সেনাদের ক্যাম্পে দীর্ঘ সাত মাস আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করেছিলো।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধচলাকালীন সময় পাক সেনাদের হাতে গুরুত্বর জখম হয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা এইচএম মহিউদ্দিন। দেশ স্বাধীনের পর ছিনতাইকারীদের কবলে পরে মুক্তিযুদ্ধের সকল কাগজপত্র খোঁয়া যায় মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিনের। যে কারণে একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়ে আজও তার নাম তালিকাভূক্ত হয়নি। মহিউদ্দিনের এক ছেলে ও দুই মেয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও বাবার মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটের অভাবে তারা সরকারী চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধের নিরব স্বাক্ষী আগৈলঝাড়া উপজেলার কাঠিরা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা শতিশ চন্দ্র রায় আক্ষেপ করে বলেন, মোর বাবা শ্যাম কান্ত রায়সহ ৪৫ জনকে ১৯৭১ সালের ২০মে কাঠিরা গ্রামে বসে ফায়ার স্কট দিয়ে হত্যা করে পাক সেনারা। বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে মুই ভারতে যাইয়া ট্রেনিং লইয়া দ্যাশে আইয়া মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়া যুদ্ধ কইরা দেশ স্বাধীন করছি। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও মোর ভ্যাগে জোটেনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের স্বীকৃতি। এমনকি মোর নিজের নামও মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভূক্ত করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অর্ন্তভূক্তির জন্য একাধিকবার জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেও কোন সুফল পাইনি।
উজিরপুর উপজেলার হস্তিশুন্ড গ্রামের সামচুল হক হাওলাদারের ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা গিয়াস উদ্দিন বলেন, দেশ মাতৃকার টানে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ৩০ জনের একটি দল তৎকালীন বিমান বাহিনীর অফিসার ও মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক একই গ্রামের নুরুল হক হাওলাদারের নেতৃত্বে প্রশিক্ষণ গ্রহনের জন্য ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলাম। ১৯৭১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকাল আটটার দিকে আমরা যশোরের কালীগঞ্জের বয়রা এলাকার বর্ডারের কাছাকাছি পৌঁছলে পাক সেনারা আমাদের লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করে। ওইসময় আমাদের দলের নেতৃত্ব দেয়া নুরুল হক হাওলাদারের কাছে শুধু একটি রাইফেল ছিলো। আমাদের জীবন বাঁচাতে নিরাপদে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে ওইসময় তিনি (নুরুল হক) পাক সেনাদের ওপর পাল্টা গুলি চালায়। একপর্যায়ে পাক সেনাদের ছোঁড়া বুলেটের আঘাতে আমাদের দলের নেতা নুরুল হক হাওলাদার শহীদ হন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর আজও তার (নুরুল হক হাওলাদার) নাম শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অর্ন্তভূক্ত হয়নি।
একইভাবে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সবধরনের কাগজপত্র থাকা সত্বেও আগৈলঝাড়া উপজেলার সেরাল গ্রামের মৃত মোঃ শামচুল হুদার নাম এখনও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভূক্ত হয়নি। ২০১৫ সালে এ বীর মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যুবরণ করেন। তার অসহায় বিধবা স্ত্রী নুরজাহান বেগম বলেন, ‘ক’ তালিকায় আমার স্বামীর নাম থাকা সত্বেও রহস্যজনকভাবে গেজেটভূক্তির পরীক্ষা নিরিক্ষার জন্য ২০২১ সালে আমাকে পাঠানো চিঠি সময়মতো পৌঁছানো হয়নি। এছাড়া স্থানীয় একটি প্রভাবশালী কু-চক্রি মহলের প্রতারনার শিকার হয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতাপ্রাপ্ত গৌরনদীর সরিকল গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম নুরুল ইসলামের সম্মানী ভাতা দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ রয়েছে। যেকারণে অর্থকষ্টে চরম মানবেতর জীবন যাপন করছেন ওই মুক্তিযোদ্ধার পরিবার। মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা ভাতাপ্রাপ্ত প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের ছেলে নাসির হাওলাদার বলেন, প্রতারনার শিকার হয়ে আমি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রীর দারস্থ হলে তিনি পুরো ঘটনা তদন্তের জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে নির্দেশ দেন। তদন্তে প্রতারকদের চিহ্নিত করা হলেও রহস্যজনক কারণে দীর্ঘ একবছরেও তদন্ত রির্পোট জমা না দেয়ায় এখনও আমাদের সম্মানী ভাতা বন্ধ রয়েছে।
অপরদিকে নিজের জীবন বাঁজি রেখে রণাঙ্গনে বীরত্বের ভূমিকা পালন করেও তালিকাভূক্ত হতে না পারার কষ্ট নিয়ে জীবন যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ২০১১ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন গৌরনদী উপজেলার জঙ্গলপট্টি গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস ছত্তার হাওলাদার। ¯’ানীয় বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের রোষানলে টানা সাতবছর ভাতা বন্ধ থাকায় নানারোগে আক্রান্ত হয়ে অর্থাভাবে বিনাচিকিৎসায় মারা গেছেন গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের সাকোকাঠী গ্রামের মৃত গঞ্জর আলী খানের ছেলে যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল খান। এ যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার একমাত্র ছেলে ভূমিহীন জামাল খান দিনমজুরের কাজ করে কোনমতে সাত সদস্যর পরিবারের ভরন পোষন জোগাচ্ছেন।
অসহায় উল্লেখিত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

 


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *